ভয়ের রাজনীতি বনাম বাস্তবতা – ভোটব্যাংকের শৃঙ্খল ভাঙবে কি বাংলার মুসলমান?

Muslim Vote in West Bengal

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাঙালি মুসলিম ভোট এক নির্ণায়ক শক্তি। কিন্তু স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা রাজনৈতিক দলগুলির কাছে ভোট ব্যাংকের বেশি কিছু নন। শাসক দলের সীমাহীন দুর্নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ অবস্থা, বিশেষ করে মুসলমান প্রধান অঞ্চলে সরকারি স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া, সরকারি চাকরি, ওবিসি, ওয়াকফ, পরিযায়ী শ্রমিক – ইত্যাদি ইস্যুতে রাজ্য সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা, একদিকে রাজ্য জুড়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির বাড়-বাড়ন্ত, সরকারি অর্থায়নে একটার পর একটা হিন্দু মন্দির তৈরি, পূজাকমিটিগুলোকে শতশত কোটি টাকা অনুদান দেওয়া – ওপর দিকে মুসলমানদের মসজিদ তৈরিতে অনুমোদন না দেওয়া, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্য়বস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া – ইত্যাদি নানা কারণে টিএমসির প্রতি মুসলমানদের ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়েছে।  যদিও বিজেপিকে ঠেকানোর জন্য অনেকেই এখনও টিএমসিকে ভোট দেওয়ার পক্ষপাতি, তবুও ২০২৬এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো টিএমসি-অথবা-বিজেপি এই বাইনারি ভাঙার কিছু ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। 

বাংলার মুসলমান সমাজের জন্য “টিএমসিকে ভোট না দিলে বিজেপি চলে আসবে” – এই ভয় থেকে বেরিয়ে এসে অন্যান্য দলগুলিকে ভোট দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত হবে, নিম্নের পরিসংখ্যান থেকে তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।


পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধানসভা কেন্দ্রগুলি – 

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫০% এর বেশি মুসলিম জনসংখ্যা) বিধানসভা কেন্দ্রগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই; কারণ ভারতের আদমশুমারি দপ্তর সরাসরি বিধানসভা কেন্দ্র ভিত্তিক ধর্মীয় জনসংখ্যার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। তবে, ২০১১ সালের আদমশুমারির ব্লক স্তরের তথ্য, নির্বাচনী সমীক্ষা এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে করা অনুমান ও বিশ্লেষণগুলো একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।

২০১১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে রাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যা: ২৭% (প্রায় ২ কোটি ৪৬ লক্ষ)। তারমধ্যে তিনটি জেলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ

মুর্শিদাবাদ: ৬৬.৩%, 

মালদা: ৫১.৩%,

উত্তর দিনাজপুর: ৪৯.৯২%

এছাড়া উল্লেখযোগ্য মুসলিম উপস্থিতি রয়েছে –

বীরভূম ৩৭.০৬%  

দক্ষিণ ২৪ পরগনা ৩৫.৫৭%


২০১১ সালের ব্লক-স্তরের জনবিন্যাস অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের যে ৪৭টি বিধানসভা আসনে মুসলিম জনসংখ্যা ৫০%-এর বেশি বা তার কাছাকাছি (নির্ণায়ক অবস্থায়) রয়েছে, জেলাভিত্তিক তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

মুর্শিদাবাদ জেলা (সর্বাধিক আসন)

এই জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৬৬.২৭%, ফলে এখানকার অধিকাংশ আসনই এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত: 

১. ডোমকল (সর্বোচ্চ, প্রায় ৮৫%) 

২. হরিহরপাড়া (প্রায় ৮০%) 

৩. লালগোলা (প্রায় ৭৭%) 

৪. ভগবানগোলা 

৫. রানিনগর 

৬. জলঙ্গি 

৭. সামশেরগঞ্জ 

৮. সুতি 

৯. রঘুনাথগঞ্জ

 ১০. জঙ্গিপুর 

১১. সাগরদিঘি 

১২. নওদা 

১৩. বেলডাঙ্গা

 ১৪. রেজিনগর 

১৫. মুর্শিদাবাদ 

১৬. খড়গ্রাম 

১৭. কান্দি

মালদা জেলা

এই জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৫১.৩%: 

১৮. সুজাপুর (প্রায় ৮২%) 

১৯. মোথাবাড়ি 

২০. মালতিপুর 

২১. রতুয়া 

২২. চাঁচল 

২৩. হরিশ্চন্দ্রপুর 

২৪. মানিকচক (প্রভাবশালী)

উত্তর দিনাজপুর জেলা

এই জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৫০%: 

২৫. গোয়ালপোখর 

২৬. চোপড়া 

২৭. ইসলামপুর 

২৮. চাকুলিয়া 

২৯. করণদিঘি 

৩০. ইটাহার

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা

৩১. ভাঙড় (প্রায় ৭০%) 

৩২. ক্যানিং পূর্ব 

৩৩. মগরাহাট পশ্চিম 

৩৪. মগরাহাট পূর্ব 

৩৫. মেটিয়াবুরুজ 

৩৬. মন্দিরবাজার

উত্তর ২৪ পরগনা জেলা

৩৭. দেগঙ্গা 

৩৮. আমডাঙা 

৩৯. বসিরহাট উত্তর 

৪০. বাদুড়িয়া 

৪১. হারোয়া 

৪২. মিনাকাঁ

বীরভূম জেলা

৪৩. মুরারই 

৪৪. নলহাটি

নদিয়া জেলা

৪৫. চাপড়া

 ৪৬. কালীগঞ্জ

৪৭. নাকাশিপাড়া


পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে প্রায় ১২৫টি আসনে মুসলিম ভোটাররা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন। বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির নেতৃত্ব যদি বিচক্ষনতা ও একতার পরিচয় দিতে পারে তবে এই ১২৫টি আসনে তারা জয়লাভ করতে পারবে। ২০১১ সালের জনবিন্যাস প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এই ১২৫টি আসনের একটি জেলাভিত্তিক বিন্যাস নিচে দেওয়া হলো:

মুর্শিদাবাদ (২২টি আসন)

এই জেলার প্রায় সব আসনেই মুসলিম জনসংখ্যা ২৫%-এর বেশি (জেলায় গড় ৬৬%):

  • ৫% থেকে ৮৫%+ আসন (১৪টি): ডোমকল, হরিহরপাড়া, জলঙ্গি, লালগোলা, ভগবানগোলা, রানিনগর, সুতি, সামশেরগঞ্জ, রঘুনাথগঞ্জ, জঙ্গিপুর, সাগরদিঘি, নওদা, বেলডাঙ্গা, রেজিনগর।
  • ২৫% থেকে ৫০% আসন (৮টি): ফরাক্কা, মুর্শিদাবাদ, নবগ্রাম, খড়গ্রাম, কান্দি, ভরতপুর, বড়ঞা, বহরমপুর।

মালদা (১২টি আসন)

জেলায় গড়ে ৫১% মুসলিম জনসংখ্যা থাকায় সব আসনেই প্রভাব রয়েছে:

  • ৫০%+ আসন (৭টি): সুজাপুর, মোথাবাড়ি, রতুয়া, চাঁচল, হরিশ্চন্দ্রপুর, মালতিপুর, বৈষ্ণবনগর।
  • ৩০% থেকে ৫০% আসন (৫টি): মানিকচক, গাজোল, হাবিবপুর, ইংরেজবাজার, মালদা (এসসি)।

উত্তর দিনাজপুর (৯টি আসন)

  • ৫০%+ আসন (৬টি): চোপড়া, ইসলামপুর, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া, করণদিঘি, ইটাহার।
  • ২৫% থেকে ৫০% আসন (৩টি): হেমতাবাদ, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ।

দক্ষিণ ২৪ পরগনা (২১টি আসন)

এই জেলায় মুসলিম ভোটারদের ঘনত্ব উত্তর ও দক্ষিণ—দুই অংশেই প্রবল:

  • আসনসমূহ: মেটিয়াবুরুজ, ভাঙড়, ক্যানিং পূর্ব, ক্যানিং পশ্চিম, মগরাহাট পূর্ব, মগরাহাট পশ্চিম, মন্দিরবাজার, ডায়মন্ড হারবার, ফলতা, সাতগাছিয়া, বিষ্ণুপুর, কুলপি, রাইদিঘি, জয়নগর, বাসন্তী, গোসাবা, মহেশতলা, বজবজ, সোনারপুর দক্ষিণ, বারুইপুর পশ্চিম, বারুইপুর পূর্ব।

উত্তর ২৪ পরগনা (১৮টি আসন)

  • আসনসমূহ: বসিরহাট উত্তর, বসিরহাট দক্ষিণ, বাদুড়িয়া, হাড়োয়া, মিনাখাঁ, দেগঙ্গা, আমডাঙা, স্বরূপনগর, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি, হাসনাবাদ, হাড়োয়া, রাজারহাট-নিউটাউন, রাজারহাট-গোপালপুর, দত্তপুকুর, দেগঙ্গা, অশোকনগর, হাড়োয়া।

নদীয়া (১২টি আসন)

  • আসনসমূহ: চাপড়া, কালীগঞ্জ, নাকাশিপাড়া, তেহট্ট, পলাশিপাড়া, কৃষ্ণগঞ্জ, কৃষ্ণনগর উত্তর, কৃষ্ণনগর দক্ষিণ, শান্তিপুর, হরিণঘাটা, চাকদহ, করিমপুর।

বীরভূম (১১টি আসন)

  • আসনসমূহ: মুরারই, নলহাটি, হাসন, রামপুরহাট, ময়ূরেশ্বর, নানুর, দুবরাজপুর, সিউড়ি, বোলপুর, ইলামবাজার, লাভপুর।

পূর্ব বর্ধমান ও হুগলি (১২টি আসন)

  • পূর্ব বর্ধমান: কেতুগ্রাম, মঙ্গলকোট, আউশগ্রাম, বর্ধমান উত্তর।
  • হুগলি: সপ্তগ্রাম, পান্ডুয়া, জাঙ্গিপাড়া, চণ্ডীতলা, খানাকুল, ফুরফুরা শরিফ সংলগ্ন এলাকা।

কোচবিহার ও দক্ষিণ দিনাজপুর (৮টি আসন)

  • কোচবিহার: শীতলকুচি, দিনহাটা, সিতাই, মেখলিগঞ্জ।
  • দক্ষিণ দিনাজপুর: কুশমন্ডি, হরিরামপুর, কুমারগঞ্জ, গঙ্গারামপুর।

পরিসংখ্যানগত বিভাজন:

প্রভাবের মাত্রামুসলিম জনসংখ্যার হারআসনের সংখ্যা (প্রায়)
একচ্ছত্র (Dominant)৫০% – ৮৫%৪৭টি
অত্যন্ত উচ্চ (Very High)৪০% – ৫০%২৮টি
নির্ণায়ক (Determining)২৫% – ৪০%৫০টি
মোট নির্ণায়ক আসন২৫% এর বেশি১২৫টি

সংরক্ষিত আসন: 

এই ১২৫টি আসনের মধ্যে বেশ কিছু আসন তফশিলি জাতি (SC) ও উপজাতি (ST) দের জন্য সংরক্ষিত, কিন্তু সেখানেও মুসলিম ভোটাররা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন।

উপসংহার: 

যে ৪৭টি বিধানসভাতে মুসলমান জনসংখ্য়া  ৫০% – ৮৫% সেখানে  “টিএমসিকে ভোট না দিলে বিজেপি চলে আসবে” – এই ভ্রান্ত ধারণা মন থেকে একেবারেই ঝেড়ে ফেলা উচিত।

যে ২৮টি বিধানসভাতে মুসলমান জনসংখ্য়া  ৪০% – ৫০% সেখানেও  “টিএমসিকে ভোট না দিলে বিজেপি চলে আসার” – কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

যে ৫০টি বিধানসভাতে মুসলমান জনসংখ্য়া  ২৫% – ৪০% সেখানে মুসলমান ভোট যাতে কোনো ভাবে ভাগ না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা উচিত।

শাসক দলের ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষতা, সীমাহীন দুর্নীতি, এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, – সবেতেই চরম নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেতে বাংলার মানুষ যখন বিকল্পর সন্ধান করছে, তখন বাঙালি মুসলমানরা যদি “টিএমসিকে ভোট না দিলে বিজেপি চলে আসবে” – শুধুমাত্র এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে, তবে আগামী প্রজন্ম তাদের ক্ষমা করবে না।

Leave a Reply