মধ্যযুগে অবিভক্ত বাংলার মুসলমান শাসকরা অর্থাৎ গৌড়ের সুলতান, মুঘল সুবেদার এবং মুর্শিদাবাদের নবাবরা জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালিদেরকেই সম্মানজনক সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। যে সুযোগ আগে অর্থাৎ সেন আমলে শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের জন্য নির্ধারিত ছিল। নিম্ন বর্ণের মানুষদের না ছিল কোন সম্মানজনক পেশা, না ছিল কোন সামাজিক মর্যাদা। মুসলমান শাসনামলে অসংখ্য হিন্দু বাঙালি মুসলমান শাসকদের অধিনে সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। যে সব হিন্দুরা সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতেন মুসলমান শাসকরা তাদের সম্মানজনক পদবী দিয়ে সামাজিক সম্মান ও মান-মর্যাদা লাভের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মুসলমান শাসকদের দেওয়া সেই পদবীগুলো বাঙালি হিন্দুরা আজও বংশ পরস্পরায় তাদের নামের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের বংশের মর্যাদা রক্ষা করে চলেছেন। এই পদবীগুলো মধ্যযুগে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের মিলিত বাঙালি সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।
অধিকারী
মনে করা হয় প্রায় ৭০০ বছর আগে গৌড়ের সুলতানদের শাসনকালে ১৩৩৪ থেকে ১৫৩৮ সালের মধ্যে এই অধিকারী পদবীর জন্ম হয়েছে। সে সময় কিছু ব্য়ক্তিকে কয়েকটি গ্রামের খাজনা আদায়ের স্বত্ব বা গ্রাম শাসন করার অধিকার দেওয়া হত, যারা সেই গ্রামগুলি শাসনের অধিকার পেতেন, তাদের উপাধী হত অধিকারী। পরে তারা বংশপরস্পরায় এটাকে পদবী হিসাবে ব্য়বহার করতে থাকে। এভাবেই অধিকারী পদবীর জন্ম বলে অনেকে মনে করেন। বর্তমানে কর্মকার, নমঃশূদ্র, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব, মাহিষ্য, মালাকার, যোগী, রাজবংশীক্ষত্রিয়, মালী, সদ্-গোপ, সবিতৃ, সভাসুন্দর ইত্যাদি বিভিন্ন জাতি এবং মুসলমান বাঙালিদের মধ্যেও অধিকারী পদবী দেখা যায়।
(একটা সময় যাত্রাদল, কীর্তনদলের অধ্যক্ষদের অধিকারী বলা হত, কিন্তু যাত্রাদল বা কীর্তনদলের অধ্যক্ষ সবসময় বংশপরস্পরায় অধ্যক্ষ থাকবেন তার কোনো মানে নেই, তাই এইভাবে অধিকারী পদবীর জন্ম হয়েছে বলে মনে হয় না। কুচবিহারের রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত পুরোহিতদের অধিকারী পদবী দেওয়া হত। অর্থাৎ মুষ্টিমেয় কিছু ব্রাহ্মণ শুধু এই পদবী পেতেন, সবাই নয়।)
ওহদেদার/ওয়াদ্দেদার

‘ওয়াদা’ শব্দের অর্থ প্রতিশ্রুতি, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরবি-ফার্সি শব্দ ‘দার’। মুসলমান শাসনামলে প্রতিশ্রুত খাজনা আদায়ের জন্য নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের বলা হত ওয়াদাদার। সেখান থেকেই ওহদেদার বা ওয়াদ্দেদার এসেছে বলে অনুমান।
কাগজী
ফার্সি শব্দ কাঘজ থেকে কাগজ। কাগজের আবিস্কার চিন দেশে হলেও ভারতে তথা বাংলায় কাগজের আগমন ঘটে ইসলামের অনুসারীদের হাত ধরে। গৌড়ের সুলতানরা কাগজ তৈরীর কারখানা স্থাপন করেছিলেন। চিনা ভ্রমণকারীদের বর্ননায় পাওয়া যায় – মুর্শিদাবাদে তুঁত গাছের ছাল থেকে কাগজ তৈরি হত। এই কাগজ ছিল খুব সাদা এবং মৃগ চর্মের মতো মসৃন। যারা এই পেশায় নিযুক্ত হতেন তাদের পদবী দেওয়া হয়েছিল – কাগজী। কায়স্থ জাতি এবং মুসলমানদের মধ্যে এই পদবী দেখা যায়।
কয়াল
‘কয়াল’ শব্দটি আরবি মানে হিসাবরক্ষক। মুসলমান শাসনামলে যেসব সরকারি কর্মচারি ধান, চাল বা অন্যান্য শস্য ওজন ও হিসাব করার কাজ করতেন তাদের উপাধী দেওয়া হয়েছিল কয়াল। তার থেকে কয়াল পদবীটি এসেছে। পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়, রাজবংশী, নমঃশূদ্র, মাহিষ্য, সদগোপ, নবশাখ এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে পদবীটি প্রচলিত আছে।
ফৌজদার
ফৌজদার অর্থ সেনাপতি বা কোতোয়াল। ফৌজ একটি আরবী শব্দ। বাংলার সুলতানি আমলে হিন্দুদের মধ্যে অচ্ছুত এবং নিম্ম বর্ণের অনেক মানুষ অর্থ এবং সামাজিক মর্যাদা লাভের আশায় সুলতানের সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করতেন, যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের মধ্যে অনেকেই সেনাপতি বা ফৌজদার পদমর্যাদা লাভ করতে পারতেন। পরে তারা নিজেদের সামাজিক মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে এটাকে পদবী হিসাবে গ্রহন করেন। তিলি, নমঃশূদ্র, পৌন্ড্রক্ষত্রিয়, বৈশ্যসাহা, সদগোপ জাতির মধ্যে এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই পদবী দেখা যায়।
পোদ্দার
পোদ্দার এসেছে ‘ফোতাদার’ থেকে। ‘ফোতা’ বা ‘ফোত্হ্’ অর্থ টাকার থলি। এই ফোত্হ্-দার এর কাজ ছিল সোনা-রূপা যাচাই বা বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে টাকা ধার দেওয়া। আরবী শব্দ ‘ফুত্বহ’ এবং ফার্সি শব্দ ‘দার’। সেই ‘ফুত্বদার’ থেকে ‘ফোৎদার’, তারপরে ‘পোৎদার’ ও শেষে পোদ্দার।
কানুনগো/কানুনগোই

আরবি শব্দ কানুন মানে আইন, এবং ফার্সি শব্দ গোয়্ মানে জ্ঞানী অর্থাৎ আইনজ্ঞ। মুসলমান শাসনামলে এঁরা ছিলেন রাজস্ববিভাগীয় হিসাব পরীক্ষক বা রাজস্ব কর্মচারী। এঁদের কাজ ছিল রাজস্বের হিসেবে রাখা, রাজস্ব আদায়, জমির মূল্য ও স্বত্ব নির্ধারণ, জমি হস্তান্তর করা ইত্যাদি। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
খান/খাঁ
তুর্কি এবং মোঙ্গোল ভাষায় খান অর্থ দলপতি বা নেতা বা রাজা। মুঘল বাদশাহরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের ‘খান’ উপাধি দিতেন। মূলত সামরিক বাহিনীর লোকদের এই উপাধি দেওয়া হলেও জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যও এই উপাধি দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
খাসনবিশ/খাসনবীশ
‘খাস’ আরবি শব্দ – অর্থ বিশেষ বা নিজের। নবাবি আমলে যারা রাষ্ট্রের নিজস্ব মালিকানার জমি অর্থাৎ খাস-জমির দেখাশোনা করতেন, তাদের উপাধি ছিল খাসনবিশ। এঁরা ছিলেন খাস-জমির হিসেবরক্ষক। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
গোলদার
নবাবের পক্ষ থেকে যারা গ্রামে গ্রামে শস্য গোলার তদারকি করতেন, তাদের উপাধি ছিল গোলাদার, তার থেকে গোলদার। নবাবের সৈন্য বাহিনীর জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই ছিল এদের কাজ। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
চাকলাদার
মুঘল আমলে কয়েকটি পরগণা নিয়ে গঠিত হত চাকলা। এইসব চাকলা দেখাশোনার জন্য নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীকে চাকলাদার বলা হত। সেখান থেকেই এই পদবীর উৎপত্তি হয়েছে।
চোঙ্গাদার/চোঙদার
মুসলমান শাসনামলে সরকারী দলিল বা গুরুত্বপূর্ণ নথি একজায়গা থেকে অন্যজায়গায় পাঠানোর জন্য একমুখ বন্ধ এবং অপর মুখে ঢাকনা দেওয়া একধরণের চোঙার ব্যবহার করা হত সুরক্ষার জন্য। এই চোঙার মধ্যে চিঠি বা দলিল রোল করে গুটিয়ে রাখা হত। যিনি এই চোঙ বা চোঙ্গা সরবরাহ করতেন তাঁকে চোঙ্গাদার বা চোঙদার বলা হত।
চৌকিদার
চৌকি শব্দের অর্থ পাহারা দেওয়ার ঘাঁটি। যিনি এই ঘাঁটি সামলান, তিনি হলেন চৌকিদার অর্থাৎ পাহারাদার।
চোপদার
ফারসি চুব্-দার থেকে চোবদার, তার থেকে চোপদার। মুসলমান শাসনামলে যে বিশেষ কর্মচারী সুসজ্জিত হয়ে সার্বভৌম শাসন ক্ষমতার প্রতিক আসা-লাঠি (রাজদণ্ড) বহন করে নিয়ে যেত, তার উপাধি ছিল চোপদার। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
জোতদার/জোদ্দার
চাষাবাদ করার যোগ্য জমিকে জোত বলে। মুঘল আমলে বড়ো বড়ো জোত যাদেরকে স্বত্ব দেওয়া হত, তাদেরকে জোতদার বলা হত। জোতদার থেকে জোদ্দার পদবীর উৎপত্তি হয়েছে।
জোয়ারদার
মুঘল অশ্বারোহী বাহিনীতে ঘোড়ার খাদ্য হিসাবে জোয়ারের ব্যাপক প্রচলন ছিল। যে সব কর্মচারী সৌন্যবাহিনীতে জোয়ার সরবরাহের তদারকি করত, তাদের জোয়ারদার বলা হত। এই পদবীর উৎপত্তি সেখান থেকেই হয়েছে বলে মনে করা হয়।
তরফদার
মুঘল আমলে শাসনকার্য ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য সমগ্র রাজ্যকে কয়েকটি পরগণায় ভাগ করা হয়। আবার পরগণার ভাগ কে বলা হতো তরফ। এই তরফের রাজস্ব আদায় ও শান্তি রক্ষার কাজে নিযুক্ত সরকারী কর্মচারী কে বলা হত তরফদার। সেখান থেকেই এই পদবীর উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
তহসিলদার/তহশীলদার
তরফ এর মতো তহসিল একটি আরবি শব্দ যার অর্থ রাজস্ব বা খাজনা। এবং দার শব্দটি ফার্সি; এর অর্থ ওয়ালা বা মালিক। তহসিলদার/তহশীলদার এর অর্থ খাজনা আদায়কারী। মুঘল যুগে যারা মহাল, ডিহি বা মৌজা ইত্যাদি যে কোনও জমিদারীর অংশের খাজনা আদায় করত, তাদের উপাধী ছিল তহশীলদার।
তালুকদার
তালুক আরবি শব্দ, অর্থ – ভূসম্পত্তি। সাধারণভাবে, ভূসম্পত্তির মালিক হলো তালুকদার। মুঘল আমলে ছোট ছোট সেনাপতিদের বেতন হিসাবে যে ভূসম্পত্তি দেওয়া হত, তাকে বলা হত তালুক এবং সেই সেনাপতিকে বলা হত তালুকদার। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, কৈবর্ত্ত, তিলি, নমঃশূদ্র, কর্ম্মকার ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির মধ্যে এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এই তালুকদার পদবীটি পাওয়া যায়।
দর্জি/দর্জ্জি
দর্জি অর্থাৎ পোশাক তৈরি পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি। ভারতে সেলাই করা পোশাক পরার প্রচলন হয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাসকদের যুগে। তার আগে ভারতের মানুষ পোশাক সেলাই করে পরতে জানত না। কাজেই ভারতে ইসলাম আগমনের পূর্বে দর্জির অস্তিত্ব ছিল না। ইসলাম আগমনের পর সামাজিক সম্মান লাভের আশায় নিম্ন বর্ণের অনেক মানুষ এই পেশা বেছে নেয় এবং এটাকে পদবী হিসাবে গ্রহন করে। ব্যগ্রক্ষত্রিয় ও নমঃশূদ্র জাতির মধ্যে এই পদবী লক্ষ করা যায়।
দস্তিদার
মুঘল যুগে রাজকীয় দলিল-দস্তাবেজ অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি এবং সিলমোহর যে সরকারি কর্মকর্তার তত্বাবধানে থাকত, তার উপাধী ছিল দস্তিদার।
দেওয়ান
ফার্সি শব্দ দীবান মানে রাজস্ব, তার থেকে দেওয়ান। মুঘল আমলে রাজস্ব আদায় বিভাগের প্রধান কর্মকর্তাকে বলা হত দেওয়ান। সেখান থেকে এই পদবীটা এসেছে।
নস্কর এবং লস্কর
মুঘল আমলে সাধারণ পদাতিক সৈন্য এবং নৌবাহিনীর সৈন্যদের বলা হত ‘লস্কর’, – সেখান থেকে এই পদবীটি এসেছে। নস্কর শব্দ এসেছে লস্কর শব্দ থেকে। নিম্নবর্ণের হিন্দু বাঙালি এবং মুসলমান বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখা যায়।
নায়েব
আরবি শব্দ নায়িব মানে প্রতিনিধি বা অধস্তন ব্যক্তি। নবাবি আমলে জমিদারি পরিচালনার জন্য এক শ্রেণীর কর্মচারী নায়েব নামে পরিচিত ছিলেন। তার থেকে এই পদবীটি এসেছে। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
নায়ক/নায়েক/লায়েক
মুঘল আমলে প্রতি পঁচিশ জন সেনার নেতৃত্বদানকারী সেনাধ্যক্ষকে নায়েক বলা হত। ভারতের সেনাবাহিনীতে এখনও এই পদটি রয়েছে। ভারতের সেনাবাহিনীতে সিপাহির উপরে এবং হাবিলদারের নিচের পদ কে নায়েক বলে। মুঘল আমলের এই নায়েক পদটি থেকে নায়েক পদবীটি এসেছে। নায়েক থেকে হয়েছে লায়েক। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
পত্রনবিশ/পত্রী

মুসলমান শাসনামলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পত্র বা চিঠি লেখার কাজে উচ্চ শিক্ষিত হিন্দুদের নিয়োগ করা হত। পত্রলিখনে পারদর্শী এই ব্যক্তিদের বলা হত পত্রনবিশ বা পত্রী। ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থ জাতির মধ্যে এই পদবী বেশি দেখা যায়।
পাঞ্জা/পাঁজা

ফারসি শব্দ ‘পাঞ্জা’ থেকে পাঁজা। মুঘল সম্রাটদের কাছ থেকে কেউ জমিদারি পাওয়ার বাদশাহী সনদ পেলে সেই সনদে পাঞ্জা ছাপ দেওয়া থাকত। যারা এই পাঞ্জা ছাপ দেওয়া সনদ পেত, তাদের কেউ কেউ বংশ গৌরবের স্মারক হিসাবে এটাকে নামের সঙ্গে যোগ করে। সেখান থেকেই পাঞ্জা বা পাঁজা পদবীর উৎপত্তি হয়েছে।
পোদ্দার
মুঘল আমলে যারা সোনা-রূপার বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করতে পারত এবং সুদে টাকা ধার দিত, তাদের বলা হত পোদ্দার। আরবি শব্দ ফুতুহ বা ফোতাহ, অর্থাৎ টাকার থলি, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরবি-ফার্সি শব্দ দার, দুইএ মিলে ফুতুহদার বা ফোতাহদার, তার থেকে ফোদ্দার, তার থেকে পোদ্দার।
ফৌজদার
সুলতানি আমলে এবং মুঘল বাদশাহ্দের যুগে অনেক নিম্নবর্ণের অচ্ছুত হিন্দু বাঙালি অর্থ সম্পদ এবং সামাজিক সম্মান লাভের আশায় বাদশাহি ফৌজে যোগদান করত। ফৌজের প্রধানকে বলা হত ফৌজদার । তিলি, নমঃশূদ্র, পৌন্ড্রক্ষত্রিয়, বৈশ্যসাহা, সদগোপ জাতির মধ্যে এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এই পদবী দেখা যায়।
ফড়নবিশ
মুঘল আমলে সরকারি আয়ব্যয়ের ফর্দ নির্মাণে দক্ষ কর্মচারীকে বলা হত ফর্দনবিশ। তার থেকে ফড়নবিশ।
বেরা
গৌড়ের সুলতানের সেনাবাহিনীতে যে সব হিন্দু বীর মল্ল যুদ্ধে পারদর্শীতা দেখাতে পারত, তাদেরকে সুলতানের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী নির্বাচন করা হত। তাদের উপাধি ছিল বীররায়। এই বীররায় থেকে সংক্ষেপে বেরা পদবী এসেছে।
ব্যাপারী
ব্যাপারী মানে ব্যবসায়ী। কাঁচা পাট ব্যবসার সাথে যুক্ত ব্য়ক্তি, এবং যারা পশু (ছাগল, ভেড়া, গরু, মহিষ) এবং পশুর চামড়া কেনা-বেচার ব্য়বসা করেন তাদের ব্যাপারী বলা হয়। মুঘল আমল থেকে এই পদবীর ব্য়বহার চলে আসছে। নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্য়ে এই পদবী দেখা যায়।
মল্লিক
সুলতানি আমলে অনেক নিম্নবর্ণের অচ্ছুত হিন্দু বাঙালি, অর্থ সম্পদ এবং সামাজিক সম্মান লাভের আশায়, সুলতানের সৈন্য়বাহিনীতে যোগদান করত। তাদের মধ্যে যারা জায়গীর বা জমিদারি পেতেন, তাঁদের ‘মল্লিক’ উপাধি দেওয়া হত। নিম্ন বর্ণের হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এই পদবী দেখা যায়।
মজুমদার

সুলতানি আমলে যারা এক একটা মৌজার ইজারা নিয়ে খাজনা আদায় করতেন, শাসনকার্য পরিচালনা করতেন, তাদের বলা হত মৌজাদার। মুঘল আমলেও এই পদটির অস্তিত্ব ছিল। এই মৌজাদার থেকে মজুমদার পদবীটি এসেছে। উগ্রক্ষত্রিয়, কর্মকার, কায়স্থ, তিলি, নমঃশূদ্র, পাটনী, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়, বায়ুজীবী, বৈদ্য, বৈশ্যকপালী, বৈশ্যসাহা, ব্রাহ্মণ, মল্লক্ষত্রিয়, মালী, মাহিষ্য, মোদক, যোগী, রাজবংশীক্ষত্রিয়, সদ্গোপ, সবিত, সভাসুন্দর, সাহবণিক, সূত্রধর, হাড়ি কায়স্থদের মধ্যে এই পদবী দেখা যায়, মুসলমানদের মধ্য়েও এই পদবি রয়েছে।
মহলানবিশ

মুঘল আমলে মহল্লা বা পাড়ার সরকারি হিসাব রক্ষককে বলা হত মহল্লানবিশ। তার থেকে মহলানবীশ পদবী এসেছে। কায়স্থদের মধ্যে এই পদবী বেশি দেখা যায়।
মুস্তাফি
আরবি শব্দ মুস্তাফি মানে মনোনিত, পছন্দসই, প্রজ্ঞাবান ইত্যাদি। মুঘল আমলে দেওয়ানি কার্যালয়ের প্রধান হিসাবরক্ষকের উপাধি ছিল মুস্তাফি। সেখান থেকে মুস্তাফি পদবীটি এসেছে।
মাণিক্য
ত্রিপুরার রাজাদের পদবী। ত্রিপুরার রাজমালায় উল্লেখ আছে – বাংলার মুসলমান সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (মতান্তরে ইলিয়াস শাহের পুত্র সুলতান সিকান্দার শাহ) ত্রিপুরা জয় করে ‘রাজা-ফা’কে সিংহাসন চ্য়ুত করেন এবং ‘রত্ন-ফা’কে সিংহাসনে বসান। সুলতান ‘রত্ন-ফা’ কে মাণিক্য উপাধী প্রদান করেছিলেন এবং এটি ত্রিপুরার রাজাদের ঐতিহ্যবাহী বংশগত উপাধি হয়ে ওঠে, যা ত্রিপুরার শাসকদের ‘মাণিক্য’ হিসেবে পরিচিতি দেয়।
মালিক
আরবি শব্দ, অর্থ – প্রভু, কর্তা, অধিপতি ইত্য়াদি। সুলতানের পরেই যার ক্ষমতা এবং সম্মান সবচেয়ে বেশি ছিল, তিনি হচ্ছেন ‘মালিক’। মালিক উপাধী যারা পেতেন, তাদেরকে সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ উত্তারাধিকরী বলে মনে করা হত। সাধারনত সুলতানের বংশের লোকেরা এই উপাধী পেলেও, হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের উপযুক্ত এবং বিশ্বস্ত অভিজাত ব্য়ক্তিদের মধ্যে কাউকে কাউকে এই উপাধী দেওয়া হত।
রায়

‘রায়’ এসেছে ‘রাজন’ শব্দ থেকে। রাজন থেকে রাজা তার থেকে রায়া তার থেকে রায়। গৌড়ের সুলতানদের দরবারে যে সমস্ত হিন্দু বীর উচ্চ পদস্থ সেনাপতির পদে নিযুক্ত হতেন, তাদেরকে বিশাল বিশাল এলাকার জমিদারি বা রাজত্ব দেওয়া হত এবং তাদের উপাধি হত ‘রায়’। পদমর্যাদায় এঁরা রাজা – মহারাজা ছিলেন। রায় পদবীটি ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য ছাড়াও আরও অনেক জাতি এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেও দেখা যায়
শিকদার

মুঘল আমলে পরগণার প্রধানকে শিকদার বলা হত। সেখান থেকেই পরে পদবীটি এসেছে। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
সমাজদার/সমাদ্দার
মুঘল আমলে যেসব সরকারি কর্মচারী জেলার চাষাবাদ পরিদর্শন করতেন এবং চাষিদের মধ্য়ে বিবাদের ফয়সালা করতেন, তাকে বলা হত সমাজদার বা সমাদ্দার। গ্রাম্য সমাজে তাদের বিশেষ সম্মান ছিল। সেখান থেকে এই পদবীটা এসেছে।
সরকার

ফার্সিতে সরকার মানে শাসনকর্তা। সরকার বলতে মুঘল আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিকে বোঝাত। যারা মুঘল আমলে সরকারের বিভিন্ন পদে নিযুক্ত ছিলেন, তারা সমাজিক সম্মানের জন্য় নিজেদের নামের সঙ্গে সরকার শব্দটা যোগ করতেন। এইভাবে সরকার পদবীর উৎপত্তি হয়েছে। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, কর্ম্মকার, উগ্রক্ষত্রিয়, কৈবর্ত্ত, মুসলমান সবার মধ্য়ে এই সরকার পদবী দেখা যায়।
সরদার
ফার্সি এবং তুর্কি ভাষায় সরদার মানে নেতা বা দলপতি। মুসলমান শাসনামলে মর্যাদার প্রতীক হিসাবে সরদার পদবীটি সামরিক, রাজনৈতিক এবং সামাজে নেতৃস্থানীয় অভিজাত ব্য়াক্তিদের দেওয়া হত। হিন্দু,মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিদের মধ্যে এই পদবী দেখতে পাওয়া যায়।
সরখেল
সরখেল এর আক্ষরিক অর্থ “উচ্চ পদমর্যাদা” বা “সম্মানিত ব্যক্তি”। নবাবি আমলে বিশেষ সম্মান বা বিশেষ মর্যাদা বোঝাতো বাঙালি হিন্দুদের এই পদবী দেওয়া হত। সাধারণভাবে ব্রাহ্মণ, সবিতৃব্রাহ্মণ এবং নমঃশূদ্র জাতির মধ্যে পদবীটি চোখে পড়ে।
সাঁপুই/সাপুই
মুঘল আমলে আদালতে প্রমাণ দাখিল করার কাজে জড়িত থাকা ব্যক্তিকে সাবুদ বলা হত। ‘তার থেকে পরে ‘সাঁপুই’ হয়েছে। মাহিষ্য, কর্ম্মকার, পৌন্ড্রক্ষত্রিয়, ব্যগ্রক্ষত্রিয় ইত্যাদি জাতির মধ্যে এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সাঁপুই পদবীটি দেখা যায়।
হাজরা

মুঘল আমলে এক হাজার সৈন্যের সেনাপতিকে হাজারী বলা হত। তার থেকে হাজরা। হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্য়ে এই পদবী দেখা যায়।
হালদার
মুঘল আমলের ‘হাবিলদার’ (সেনাধ্যক্ষ) থেকে হালদার পদবীটি এসেছে। বর্তমানে ভারতের সেনাবাহিনীতে এবং পুলিশে এখনও এই পদটি রয়েছে। হাল লাঙল বা নৌকার হালের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ ব্রাহ্মণদের মধ্যেও এই পদবী দেখা যায়, আবার মন্দিরের পূজারী হওয়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, কারণ নমঃশূদ্র এবং মুসলমানদের মধ্য়েও এই পদবী দেখা যায়। ব্রাহ্মণ, মাহিষ্য, যাদব, কর্ম্মকার, কৈবর্ত্ত, নমঃশূদ্র ইত্যাদি জাতির মধ্যে এবং মুসলমানদের মধ্য়ে হালদার পদবীটি রয়েছে।
তথ্যসুত্রঃ
পদবীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস – শ্রী খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক।
আমাদের পদবীর ইতিহাস – লোকেশ্ব বসু।
