সরকারের টাকায় মন্দির তৈরি সংবিধান বিরোধী – হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা।

Construction of Temples Using Government Funds Is Unconstitutional — Public Interest Litigation Filed in High Court.

ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতীয় সংবিধানের একটি মৌলিক এবং অ-আলোচনাযোগ্য নীতি। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ধর্মহীনতা বোঝায় না; বরং এটি নির্দেশ দেয় যে রাষ্ট্র ধর্মবিশ্বাসের বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে। রাষ্ট্রের নিজের কোনো ধর্মীয় পরিচয় থাকবে না; রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে বিশেষ অনুগ্রহ করবে না বা কোনো ধর্মের হয়ে প্রচার করবে না।


ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৫, ২৫, ২৭ এবং ২৮ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারত রাষ্ট্র সকল ধর্ম থেকে নীতিগতভাবে সমদূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য। রাষ্ট্র সকল ধর্মের সঙ্গে সমানভাবে আচরণ করবে, কোনো ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না এবং কোনো ধর্মের পক্ষপাত করবে না। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রচার বা সেই প্রচারের জন্য অর্থায়নও করবে না।



অথচ আমরা দেখেছি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইসকনের মত একটা বহুজাতিক সংস্থাকে হিন্দু মন্দির তৈরি করার জন্য কর-মুক্ত ৭০০ একর জমি দিয়েছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। মুসলমান মৎসজীবিদের গ্রামের নাম “মিয়াপুর”-কে অবৈধভাবে পরিবর্তনকরে মায়াপুর করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ২০০–২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করে দিঘায় সরকারি জায়গার উপর জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করেছে। সরকারি অর্থায়নে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা ও মিডিয়া প্রচার করা হয়েছে। রাজ্য জুড়ে এক কোটিরও বেশি বাড়িতে সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা—অর্থাৎ রেশন দোকানের মাধ্যমে “ভগবান জগন্নাথের মহাপ্রসাদ”এবং ভগবান জগন্নাথের ছবিযুক্ত কার্ড বিতরণ করা হয়েছে, যার জন্য সরকারি কর্মকর্তা ও সম্পদ ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধরনের কার্যক্রম অন্য কোনো ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।


রাজ্য সরকার “কলকাতার নিউটাউনে দুর্গাঙ্গন নির্মাণ” প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার আনুমানিক ব্যয় হবে ২৬২ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত “দুর্গাঙ্গন” মন্দিরটি যে জমিতে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, তা মূলত কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিল্প ইউনিট স্থাপনের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল ও সংরক্ষিত ছিল। কোনো ধর্মীয় বা অ-শিল্প ব্যবহারের জন্য তা নির্ধারিত ছিল না।


পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিলিগুড়ির উপকণ্ঠে মাটিগাড়ায় কয়েক শত কোটি টাকা খরচ করে সরকারি জায়গায় একটি “মহাকাল মন্দির” নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেছে, এই জায়গাটিও শিল্প স্থাপনের জন্য নির্ধারিত ছিল।


রাজ্য সরকারের এই ধরনের কার্যক্রম ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।



পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার সরকারি অর্থায়নে একটির পর একটি হিন্দু মন্দির তৈরির প্রকল্প হাতে নিলেও, দিঘায় ভ্রমণ করতে যাওয়া মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য কোনো জায়গা দেয়নি। মুসলমানরা দীর্ঘমেয়াদি লিজ নিয়ে নিজেদের অর্থায়নে মসজিদ নির্মাণের কথা বলেছে, তা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার এখনও পর্যন্ত কোনো জায়গার ব্যবস্থা করেনি। এছাড়াও রাজ্য সরকার প্রতি বছর রাজ্যের কয়েক হাজার ক্লাবকে লক্ষাধিক টাকা করে মোট কয়েক শত কোটি টাকা অনুদান দিয়ে থাকে দুর্গা পূজা করার জন্য; কিন্তু অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব পালনের জন্য অনুরূপ কোনো অনুদান আমরা দেখি না।


রাষ্ট্র যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনার জন্য জমি, আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করে কিন্তু অন্যান্য ধর্মের উপাসনার জন্য একই রকম সহায়তা সমানভাবে প্রদান করে না, যার ফলে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়, তখন ভারতীয় সংবিধানের ১৪ এবং ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন ঘটে।


শিল্প স্থাপনের জন্য নির্ধারিত জমিকে ধর্মীয় নির্মাণের জন্য রূপান্তর করা অবৈধ, স্বেচ্ছাচারী এবং ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।


রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের সম্মিলিত কল্যাণের জন্য করদাতাদের অর্থকে ট্রাস্টি হিসেবে রক্ষা করে। ধর্মীয় নির্মাণের জন্য জনসাধারণের তহবিল ব্যবহার করা এই আস্থার লঙ্ঘন, কারণ এটি বিভিন্ন ধর্মের—অথবা কোনো ধর্মের অনুসারী নন, এমন নাগরিকদের—একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে আর্থিকভাবে সমর্থন করতে বাধ্য করে; যে ধর্মে তারা বিশ্বাস করেন না। এই ধরনের জোরপূর্বক ধর্মাচরণ ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে এবং সংবিধান রাষ্ট্রের কাছ থেকে যে নৈতিক নিরপেক্ষতা দাবি করে, তা লঙ্ঘন করে।


আমাদের মনে রাখা উচিত, ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল সহনশীলতার একটি নিষ্ক্রিয় ধারণা নয়; এটি একটি সক্রিয় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, যার জন্য রাষ্ট্রকে অর্থ, নীতি এবং শাসনের ক্ষেত্রে ধর্ম থেকে নীতিগত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।


মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলার রায়ে স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে যে, যে কোনো রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ যা রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের সঙ্গে চিহ্নিত করে, অথবা একটি ধর্মের প্রতি অগ্রাধিকার বা পৃষ্ঠপোষকতা দেখায়, তা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ।



এখন প্রশ্ন হলো—তাহলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কীভাবে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শবিরোধী এ ধরনের একটির পর একটি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে?


রাজ্য সরকার এ পর্যন্ত যতগুলি হিন্দু মন্দির তৈরি করেছে বা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, সেগুলিকে সংস্কৃতি কেন্দ্র বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে। রাজ্য সরকার প্রতিবছর দুর্গা পূজা করার জন্য কয়েক হাজার ক্লাবকে কয়েক শত কোটি টাকা অনুদান দিয়ে থাকে এবং এই অনুদানের পরিমাণ প্রতিবছর বাড়ছে, এবং এই পূজা করার জন্য অর্থায়নকেও বাঙালির সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকারের সহায়তা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অথচ অন্য কোনো ধর্মীয় উৎসবের সময় বা অন্য কোনো ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণে রাজ্য সরকার একইভাবে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে না।


রাজ্য সরকারের অবশ্যই জানা উচিত যে বাঙালি কোনো একক মৌলিক জাতি নয় এবং বাঙালি সংস্কৃতি কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংস্কৃতি নয়। বাঙালি একটি মিশ্র বা শঙ্কর জাতি এবং বাঙালি সংস্কৃতি একটি বৈচিত্র্যময় মিশ্র সংস্কৃতি। হাজার বছর ধরে অগণিত নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠী একত্রে মিলিত হয়ে আজকের এই অবিভক্ত কিন্তু বৈচিত্র্যময় বাঙালি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।



কিন্তু এই বাঙালি পরিচয় বা বাঙালি আইডেন্টিটি এবং বাঙালি সংস্কৃতি নিজে নিজে তৈরি হয়ে যায়নি। বাঙালি আইডেন্টিটি তৈরি হওয়ার পেছনে মধ্যযুগের মহান সুলতানদের দূরদর্শিতা ও প্রচেষ্টা রয়েছে। হাজার বছর আগে ভারতের এই অঞ্চলে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু তাদের বাঙালি পরিচয় বা আইডেন্টিটি ছিল না। ১৩৫২ সালে সুলতান হাজী শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সর্বপ্রথম নিজে “শাহে বাঙালি” ও “শাহে বাংলা” উপাধি ধারণ করেন এবং জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার সমস্ত নাগরিকদের “বাঙালি” নামে অভিহিত করেন। তখন থেকেই আমরা নিজেদেরকে বাঙালি বলে পরিচয় দিয়ে আসছি এবং তখন থেকেই সমগ্র ভারতবর্ষের ও ভারতের বাইরের মানুষরাও আমাদের বাঙালি বলে অভিহিত করে আসছে। তার আগে বাংলার মানুষ নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিত না।


আজকের গৌরবময় বাঙালি সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পেছনেও বাংলার মুসলমান সুলতানদের অসামান্য অবদান রয়েছে। গৌড়ের মুসলমান সুলতানরাই সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় সরকারি কাজকর্ম শুরু করেছিলেন এবং বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনায় উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার আগে বাংলা ভাষায় হিন্দু ধর্মগ্রন্থ লেখা নিষিদ্ধ ছিল।

কবি কৃত্তিবাসের আত্মকাহিনি থেকে জানা যায় যে পঞ্চগৌড়েশ্বর সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ কবিকে বাংলা রামায়ণ লিখতে আদেশ করেছিলেন। বৃহস্পতি মিশ্র উল্লেখ করেছেন যে বাংলা ভাষায় গীতগোবিন্দটীকা, কুমারসম্ভবটীকারঘুবংশটীকা  ইত্যাদি রচনা করার জন্য সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ তাকে মণিময় রত্নহার, সোনার কুণ্ডল, দশ আঙুলে সোনার অঙ্গুরীয় এবং সোনার মুকুট পরিয়ে, হাতির পিঠে চড়িয়ে সম্মানিত করেছিলেন।

আজকের পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক মানুষ মধ্যযুগের মুসলমান শাসকদের দেওয়া পদবি ব্যবহার করেন। মুসলমান শাসকদের দেওয়া অধিকারী, রায়, মজুমদার, হালদার, শিকদার, সমাদ্দার, পোদ্দার, কানুনগো, পাঁজা, সাঁপুই, গোলদার ইত্যাদি অসংখ্য পদবি বাঙালি হিন্দুরা শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় ব্যবহার করে আসছেন।

এই পদবিগুলো বাংলার হিন্দু-মুসলমানের মিলিত বাঙালি সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।

আজকের স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভারতে আমরা আশা করি রাজ্য সরকার বাঙালি সংস্কৃতির উন্নতির জন্য এমন পদক্ষেপ নেবে, যেখানে জাত, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালির সমান অধিকার, সমান মর্যাদা এবং সমান অংশীদারিত্ব থাকবে।

কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, রাজ্য সরকার প্রতি বছর কয়েক শত কোটি টাকা খরচ করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসবকে প্রমোট করছে। সরকারের শত শত কোটি টাকা খরচ করে সরকারি জমিতে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনালয় তৈরি করা হচ্ছে। এক কথায় বলতে গেলে – বাঙালি সংস্কৃতির নামে, সরকারি অর্থায়নে একটা নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উপাসনা-কে সমগ্র বাঙালি জাতির উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। 

এতে করে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিভেদ বাড়ছে, রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতাবরণ বিনষ্ট হচ্ছে। এবং হাজার বছর ধরে তৈরি হওয়া বাঙালি সংস্কৃতির ঐক্য এবং বৈচিত্রকে ধ্বংস করা হচ্ছে।

বাংলার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রগতিশীল গুণীজনদের অনেকেই রাজ্য সরকারের এহেন সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করছেন, কিন্তু রাজ্য সরকার কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতায় কর্ণপাত করেনি।

তাই এ ব্যাপারে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির বিরুদ্ধে ভারতের নাগরিক এবং বিশিষ্ট সমাজকর্মি শেখ আবদুল মুরাদের পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে।

Leave a Reply